নড়াইলে সাংবাদিকের ওপর হামলা: বিচার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ
সাংবাদিকতার পেশা জনসেবা ও সত্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ, হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো নড়াইল জেলার সময় টেলিভিশনের প্রতিনিধি সৈয়দ সজিবুর রহমানের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা।
ঘটনার বিবরণ
২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর বাড়ি ফেরার পথে সজিবুর রহমান নির্মম হামলার শিকার হন। সেদিন তিনি লোহাগড়া উপজেলায় একটি সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ শেষে নড়াইল শহরে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেখ রাসেল সেতুর মাঝপথে চার থেকে পাঁচজন দুর্বৃত্ত তাঁর পথরোধ করে। হামলাকারীদের মধ্যে একজনের পরনে পুলিশের লোগোযুক্ত রিফ্লেক্টিং ভেস্ট ছিল, এবং আরেকজন নিজেকে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই মুরাদ হিসেবে পরিচয় দেন। সজিবুর রহমান নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তারা তাঁর সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করে।
হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সজিবুরের পেট, হাঁটু, গোড়ালি এবং বাঁ হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এই নৃশংস হামলার পর দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে নড়াইল সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সেদিন রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
মামলা দায়ের ও তদন্তের অগ্রগতি
হামলার ঘটনার ১১ দিন পর, ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি, নড়াইল সদর থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগী সজিবুর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বা শনাক্ত করতেও ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। তবে সজিবুরের অভিযোগ, পুলিশ যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না এবং এই বিলম্ব বিচার প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন
সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হুমকির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে সঠিক তথ্য প্রবাহ ও গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। সৈয়দ সজিবুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আক্রমণ।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: একজন সাংবাদিক যখন নিজেই নিরাপদ নন, তখন কীভাবে তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরবেন? হামলাকারীরা পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে এসেছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এ ধরনের ঘটনা জনমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
বিলম্বিত ন্যায়বিচার: একটি ভয়াবহ সংকট
বিলম্বিত ন্যায়বিচার কোনো বিচার নয়। সজিবুর রহমানের হামলার ঘটনায় পুলিশের উদাসীনতা বা অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বিলম্ব বিচারপ্রার্থীর জন্য আরও কষ্টকর হয়ে উঠছে। ভুক্তভোগী সজিবুর চিকিৎসাধীন থাকায় মামলা দায়ের করতে দেরি করেছেন, যা আইনগত প্রক্রিয়ার একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকতা। তবে মামলার পরও পুলিশের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনাই বিচারহীনতার সংস্কৃতির শিকার হয়। এ কারণে অপরাধীরা অপরাধ করার সাহস পায় এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কী করণীয়?
১. অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার: নড়াইল পুলিশকে অবিলম্বে এই হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে হবে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।
২. সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নীতিমালা: সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এই নীতিমালায় সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
3. সচেতনতা বৃদ্ধি: সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল সমাজকে এ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
4. বিচার নিশ্চিতকরণ: বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
সৈয়দ সজিবুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের ওপর এক করুণ আঘাত। এই ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সত্য প্রকাশের পথ কখনোই সহজ ছিল না। তবে সমাজের সঠিক তথ্য প্রবাহ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবাদিকতার পেশা অমূল্য। তাই এই পেশার কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।
